নামতে-নামতে

335
রাস্তায় নেমে বুঝলাম এইসময়ে ঘরের বাইরে আসা ঠিক হয়নি। যদিও আমার শহরটা গ্রামের আদলে মোড়া  নিতান্তই এক মফস্বল, তবু লকডাউনের এই সময়ে এর আগে যে কবার ঘর হতে বের হয়েছি তা বিকাল পাঁচটার আগে, পাঁচটার দিকে শহরে মুটামুটি জনসমাগম থাকে, সেই অভিজ্ঞতায় আজ ন’টার পর বেরিয়ে গা ছমছম করছে, জনমানবহীন এক ভূতুড়ে শহর, ভৌতিক ভয়-ডরের বাইরে আছে পুলিশি হয়রানির সম্ভাবনা, ভাবার বিষয় হলো এই পুলিশি হয়রানিতে পুলিশের প্রতি গতানুগতিক অনীহা-শ্লেষের বাইরে একধরনের মুগ্ধতা কাজ করছে, ভেবেছি এইবার সরকারের কাছে জোর দাবি জানাবো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব স্বাধীনতা পদক  যেনো পুলিশকে দেওয়া হয়, অথবা আগামীবার নোভেলে শান্তি পুরস্কারের জন্যে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে জুরি বোর্ডের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের নাম প্রস্তাব করা হোক , এর যথেষ্ট কার্যকারণ আছে,হাঁড়ির খবর যেমন রাঁধুনির চেয়ে ভালো কেউ বলতে পারেন না তেমনি বর্তমান মহামারীর সময়ে করোনা আক্রান্ত মানুষের কাছ হতে করোনা সংক্রমণের উপায় এবং সংক্রমণ হতে বাঁচার পন্থা ডাক্তারের চেয়ে ভালো কেউ জানে না, অথচ বাংলাদেশের বর্তমান করোনা ক্রান্তিলগ্নে যে পুলিশ অপরাধি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তারাই সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চরিত্রে ডাক্তারের মতো রোগীর পরিচর্যায়  নিয়োজিত আছে, নিজের সহ নিজের পরিবারের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পার্সনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্টের অভাবে দেশের বর্তমান ডাক্তার সমাজের  যেখানে দায়িত্ব পালনের প্রশ্নই আসে না, সেখানে পুলিশই বাড়ি-বাড়ি গিয় করোনা আক্রান্ত রোগীকে ধরে হাসপাতালে নিয়ে আসছে, করোনার লক্ষ্মণ নিয়ে রাস্তায় মরে যাওয়া মানুষ যার স্বজন আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কাছে আসছে না, সেই মরে বেওয়ারিশ হয়ে যাওয়া মানুষের লাশ কাঁধে বয়ে নিয়ে পুলিশই সৎকারের ব্যবস্থা করতেছে, বিদেশ ফেরত সমূহ করোনাবাহী মানুষ যখন হোম কোয়ারান্টাইন না মেনে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে তাকেও কোয়ারান্টাইনে ঢুকানোর দায়িত্ব পুলিশের কাঁধে, কিন্তু কই পুলিশের পরনে’তো কোনো পার্সনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট নাই, অথচ পুলিশের ঘরেও স্ত্রী-সন্তান,বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন, মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়ে যে প্রশাসন,  যে পুলিশ নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর সমুখে তারা’তো শ্রদ্ধা পেতেই পারে।
লকডাউনের সময়ে সন্ধ্যার পরে ঘর হতে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা অথবা মানষিকতা না থাকলেও এই অসময়ে বড় দায়ে পড়ে পথে নামতে হয়েছে, বিকেলে যখন ঘর হতে বের হই তখন পকেটে দুশো টাকার মতো ছিলো, বের হওয়ার পূর্বমুহূর্তেে বাবা বলেছিলেন যেভাবেই হোক যেনো কিছু টাকার ব্যবস্থা করি, আমার পরিবারে জনমানব মুটে চারজন,  আমি বাবা, মা ও ক্লাস টেন পড়ুয়া ছোট ভাই, আমার বাবা এক কালের বাম ছাত্র রাজনীতির বিপ্লবি, আমার বাবা ঢাকা ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট, সত্তরের দশকের উত্তাল সময়ে ঢাকা ভার্সিটির হাতেগোনা ছাত্রনেতাদের একজন,স্ব শস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়ার স্বপ্ন যখন বুড়িগঙ্গার জলে ভেসে গেলো তখন তিনি গ্রামে ফিরে আসেন, কিন্তু বিপ্লব ত্যাগ করেননি, স্ব শস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিত্যাগ করে যে বিপ্লবে তিনি অটুট ছিলেন তা নিজের অর্জিত বিশ্বাস হতে বিচ্যুত না হওয়া , এবং সম্ভবত তিনি তা পেরেছেন, ঢাকা ভার্সিটি হতে গ্র্যাজুয়েট হওয়া একজন মানুষ যেখানে চেষ্টা করলে যেকোনো ভালো চাকুরী জোগাড় করে নিতে পারতেন সেখানে তিনি তা না করে নিজের গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরী নিয়ে জীবনভর তাঁর ছাত্রদের বুজিয়েছেন উৎপাদনের উপায় সমূহের উপর মালিকানার দাবি।তার বিশ্বাস বিপ্লব এতো সহজে হবেনা,যে সমাজ ব্যবস্থা মানুষকে শুষিত করছে তার শেকড় একদিনে প্রোথিত হয়নি,তার  শেকড় স্ব মূলে উৎপাটন করতে হলে যুগের সঞ্চিত শক্তি নিয়ে আঘাত করতে হবে, আর সেই শক্তি সঞ্চয়ে করে সত্যিকারের বিপ্লব সংঘটিত করতে হলে মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, এইভাবে মানুষকে তার অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান দিতে দিতে নিজের ঘরসংসার করতে একটু দেরি হয়ে যায়। আমার বাবার লেট মেরেজ।
আমি জাতীয় ইউনিভার্সিটি হতে হিসাব বিজ্ঞানে অনার্স শেষ করে চাকুরী খুঁজার পাশাপাশি টিউশনি করছি,এবং আমার এই টিউশনের টাকার উপর ভর করে কোনোরকম কষ্টেসৃষ্টে ঠিকে আছে পরিবার, অথচ আমার বাবা যখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ঢাকা শহর রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তখন তার সচিবের দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি গত টার্মে  সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন, আমাদের জেলা সদরে মিটিংয়ে এসে তিনি শ্রদ্ধার সাথে বাবার সৃতিচারণ করে গেছেন, বাবা চাইলেই তার কাছে বলে আমার ভালো একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন, কিন্তু আমি জানি বাবা তা করবেন না, বাবার বিশ্বাস হচ্ছে অনুগ্রহে পাওয়া অধিকার ভিক্ষা, অর্জন হতে পারে না। আমার মা অস্টিওপরোসিসের রোগী হয়ে দীর্ঘদিন হতে হুইলচেয়ার নির্ভর, প্রতিদিন একগাদা ঔষধের পাশাপাশি মাসে সাড়ে চার হাজার টাকা দামের একটা ক্যালসিয়াম ইনজেকশন নেন, এই ইনজেকশনে দৃশ্যমান কোনো লাভ না হলেও ইনজেকশন না নিলে মায়ের চরম মানষিক অস্থিরতায় আমদের একটু ক্ষতি হয়ে যায়।
প্রথম যখন দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হয় বাবা নির্বিকার।বাবার মতো দেশ অন্ত মানুষের এমন নিরুদ্বিগ্ন আচরণ আমি ঠিক বুজতে পারি না। করোনার যে চরিত্র দেখছি তাতে একটা ব্যাপার অনুমান করা যায়, বয়েসের কারণে আমার বাবা-মা বেশ ঝুঁকিতে আছেন, বাবা সব সময় খবরের কাগজ আর নিউজ চ্যানেল নিয়ে ডুবে থাকেন, মার যেহেতু বাইরে বের হওয়ার ক্ষমতা নেই আর বাবা ডুবে আছেন কাগজ আর নিউজ চ্যানেল নিয়ে তাই দুজনের হোম কোয়ারান্টাইন নিয়ে আমি বেশ আশ্বস্ত। বাবার এমন কাগজ ঘাটাঘাটি আর টি ভি চ্যানেলে ডুব মেরে থাকার কারণ সহসা  খোলাসা হয়ে যায়, একদিন আমাকে ডেকে বলেন শোন বড় খোকা, বিশ্ব বাজার আজ ক্রেতা হীন,  সিঙ্গেল সেক্টর ডিপেন্ডেন্ট ইকোনমির দেশ টিকতে পারে না। শুধুমাত্র তেলনির্ভর ভেনেজুয়েলার টাকা কাগজ হয়ে গেছে। গার্মেন্টস নির্ভর হয়ে থাকলে আমাদেরটাও হয়ে যেতে পারে এনিটাইম। তাই সরকার বাবাকে তার সৎ ছেলে কৃষিখাতের দিকেও নজর দিতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আগামী বছর গার্মেন্টস আমাদের খাওয়াতে পারবে কিনা এই মুহুর্তে তা অনিশ্চিত, কিন্তু কৃষক লস করে হলেও আমাদেরকে খাওয়াবে। তাই এখন কৃষক-শ্রমিকের শ্রেণী শত্রুরা তাদের কাছে হাত পাতাতে বাধ্য, আর এই শোষকদের এখন শোষিতের পায়ে ধ্বর্ণা দেয়া একটা মোক্ষম সুযোগ, বিপ্লবের হাতিয়ার, কৃষক-শ্রমিকদের তাদের অধিকার সম্পর্কে বুজাতে হবে, বুজাতে হবে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্টার এমন সুযোগ তারা আগামী একশো বছরে আর পাবে না, এদেরকে সচেতন করতেই হবে।
বাবার কথা শুনে কি বলবো যদিবা তার কোনো কিনারা পাই না কিন্তু ভিতরে ভিতরে বুঝতে পারি বাবার প্রতি শ্রদ্ধাটা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বিকেলে যখন ঘর হতে বের হই তখন বাবার টাকার ব্যবস্থা করার চিন্তা ভালোভাবেই মাথায় ছিলো, ব্যবস্থার উপায় বলতে যদি দেয় তবে অগ্রিম টিউশনির টাকা নিয়ে আসা, দিনে রাতে মিলে মোট ছ’টা টিউশনি করি, তাতে মাসে আঠারো হাজারের মতো হয়ে যায়, মানে প্রতিদিন ষোলো শ’য়ের মতো। কিন্তু এক মাস হতে হোম কোয়ারান্টাইন ও লকডাউন মিলিয়ে টিউশনি বন্ধ, মানে দাঁড়াচ্ছে প্রতিদিন দেড় হাজারের উপর নগদ লস। পকেটে দু’শ টাকা নিয়ে ঘর হতে বের হই,মনে মনে ঠিক করেছিলাম এক স্টুডেন্টের বাসায় যাবো অগ্রিম টাকা চাইতে, বাসা হতে বের হয়ে দেখি অসহায় নিম্নবিত্ত মানুষেরা যে যার মতো সাহায্যের আশায় দাঁড়িয়ে আছে, দামি গাড়ি  ব্রেক করলেই সবাই গাড়ির উপর উপচে পড়ে যদি কিছু পাওয়া যায়, কোথাও কেউ-কেউ গামছায় নিজেকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে, সহজেই বোঝা যায় তারা ঠিক ভিক্ষা চাওয়ার লোক না, তবু ভিক্ষা চাইতে নেমেছে, নামতে-নামতে নিজের শেষ সিঁড়ি আত্মসম্মান টুকু গামছায় আড়াল করার চেষ্টা।
কিছু পথ এগুনোর পর পাড়ার বড় ভাই পথ আটকে দাঁড়ান, তারা সহায়হীন মানুষের জন্যে ত্রানের ফান্ড করতেছেন তাদের তহবিলে কিছু ছাড়তে হবে, আমার কিছু বলার আগেই পকেটে হাত ঢুকিয়ে দু’শ টাকার পুরোটাই রেখে দিয়ে আমাকে ছেড়ে দিলেন।কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না এরা পার্টির লোক। রাজ্যের হতাশা নিয়ে উল্টো বাসার পথে হাঁটা দিলাম, পথিমধ্যে গামছাওয়ালা সাহায্যে প্রার্থী একজনের সাথে চোখাচোখি হতেই লোকটা মাথা ঘুরিয়ে নিলো, মুহূর্ত দর্শনে কেমন চেনা মনে হলো, মানুষের অসহায়ত্বের নমুনা দেখতে দেখতে নিজেকে কেমন সহায়হীন, ক্লান্ত মনে হলো,যেই ক্লান্তিটুকু নির্বাণ হলো গভীর ঘুমে, ঘুম হতে জেগে দেখি সেই কখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব সামলে একটু ধাতস্থ হতেই মনে পড়লো বাবার বিকেলে টাকা চাওয়ার কথা, আমার বাবা, আজন্ম বিপ্লবী, ভাঙবেন তবু মচকাইবেন না, তিনিতো এতো সহজে টাকা চাওয়ার লোক না, হঠাৎ তাঁর কি এমন ঠেকা পড়লো, মা চলাফেরা করতে না পারায় ঘরে রাঁধুনির দায়িত্ব বাবার, মাঝে-মাঝে আমি তার সেকেন্ডহ্যান্ড হই, সন্তর্পণে নিজের রুম হতে বের হই, দেখি বাবা মায়ের পাশে বসে আছেন, গুটিগুটি পায়ে রান্না ঘরে প্রবেশ করি।
যা ধারণা করেছিলাম তাই ঠিক, হাঁড়িতে কিছু রান্না করা ভাত,আনাজ ছাড়া চাল রাখার পাত্র একেবারে শূন্য, তাড়াতাড়ি রান্নাঘর হতে বেরিয়ে আসি, খুব বেশি চিন্তা করার সময় নেই, এরকম সময়ে সচরাচর যা করি তাই করলাম, রাবেয়া খালাকে ফোন দেই, রাবেয়া খালা আমার এক স্টুডেন্টের মা, তার ছেলেকে প্রায় তিনবছর ধরে টিউশন করাই, মহিলা যে আমাকে এতো স্নেহ করেন তার কিছু ফিরিস্তি আমার কথায় প্রকাশ পাবে,
ভদ্রমহিলা ফোন ধরার সাথে-সাথেই আমি বলি খালা একমাস হলো টিউশনি সব বন্ধ, আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন কিছু টাকা লাগবে এইতো,তা কতো পাঠাতে হবে, আমি বলি হাজার দুয়েক হলে চলবে, বলেই মুহূর্ত সময় হজম করে বলি খালা এক হাজারই দেন, আগামি মাসে মায়ের অস্টিওপরোসিসের  ইনজেকশন নেয়ার তারিখ, যদি কোনো ব্যবস্থা না হয় আবার আপনার কাছে হাত পাততে হবে, খালা খানিকটা হেসে বলেন আগামী মাসেরটা আগামী মাসে দেখা যাবে দু’হাজারই দিচ্ছি, আমি বলি খালা, তিনি বলেন বলো, আমি বলি মানে, আবারও আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, এই টাকাগুলো কিন্তু ধার হিসাবে নিচ্ছি, মাইনে হতে কাটতে পারবেন না এইতো, দুজনেই একসাথে হেঁসে উঠি।
টাকা পাঠানোর নিয়ম খালা জানেন, মোবাইলের মেসেজ অপশন যখন ঘোষণা করলো আমার বিকাশ একাউন্টে দু’হাজার টাকা জমা পড়েছে তখন ভাবনায় পড়ি এখন এগুলো কেশ আউট করবো কোথা হতে, পরিচিত এক এজেন্টকে ফোন দিতেই সে বাসায় যাওয়ার কথা বলে, সেই মতো বের হতে যাচ্ছি বাবা বলেন এখন আবার কই যাস, আমি একটু কাজ আছে বাবা তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো, বাবা বল্লেন ঠিক আছে টেবিলে খাবার দিচ্ছি তাড়াতাড়ি ফিরে আসিছ, কেশ আউট করে ঘরে ফিরে দেখি বাবা,মা ও  ছোট ভাই ডাইনিংয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন, আমি তাড়াতাড়ি হাত ধুতে লেগে যাই, বাবা বলেন এই অবেলায় কি এমন কাজ ছিলোরে, ছোট ভাই আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বাবাকে বলে ডিস্টার্ব করো না বাবা, দেখছো না হাত ধুচ্ছে, আমি,বাবা ও মা জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে ফিরে তাকাই, সে তার মতো করে বলে বাবা, মানুষের জন্যে যে পৃথিবী তুমি আজন্ম কল্পনা করে এসেছ সেই পৃথিবীতে আজ আমাদের এখানে এই করোনাকালে মানুষের কয়েকটা শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে, এক শ্রেণীর অগুনিত টাকা, তারা সাধারণ মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করছে, তারা হচ্ছে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত যারা এতোদিন কিছু সঞ্চয় করেছিলো তারা নিজেকে বাঁচাতে সেই সঞ্চয়ে হাত দিয়েছে, নিম্নবিত্ত যাদের কোনো উপায় নেই তারা ত্রানের পিছু দৌড়াচ্ছে নয়তো অভিজাত গাড়ি দেখলে রাস্তায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে যায়, আর আমাদের মতো যারা নিম্ন মধ্যবিত্ত, যারা লোকলজ্জার ভয়ে মানুষের কাছে হাত পাততে পারে না তাদের জন্যে করোনা মুকাবিলা করার জন্যে শুধু হাত ধুয়া, চলো সবাই মিলে হাত ধুই বলেই সে আমার দিকে হাঁটা দেয়, আমি তার হাত ধরে বলি এসব কি হচ্ছে?  সে আমাকে বলে ভাইয়া, নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের ক্রমো মানের কোনো অবস্থান নয়, নিম্নমধ্যবিত্ত একটি গালি, একটি শুয়োরের নাম।
খাওয়া শেষ করে শুয়ে আছি অনেক সময়, চোখ বন্ধ, ঘুম আসবে আসবে মনে হচ্ছে, হঠাৎ মাথায় কারও স্পর্শ পেয়ে চোখ মেলি দেখি বাবা,
বাবার হাত ধরে বলি, বাবা কোনো সমস্যা, বাবা ধরা গলায় বলেন, এক মাস হলো টিউশনি নাই, জানি তুই কোথাও টাকা পাবি না, ঘরে একটাও চাল নাই, তোর মায়ের খালি পেটে অষুধ খাওয়া নিষেধ, তাই বড়ো দায়ে পড়ে গামছা মুখে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম, তোর মায়ের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না, আমি বলি তাতে কোনো অপরাধ নেই বাবা, এর পরেও যদি তুমি হীনমন্যতায় ভোগো তবে হাত ধুয়ে নেও, বাবা হেসে উঠেন, আমি কেশ আউট করা টাকা বাবার হাতে দিয়ে বলি যে ভাবে যা পারো চালিয়ে নাও, বাবা টাকা হাতে নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বের হয়ে যান। আমি ভাবি আমার বাবা, তার ছেলের চাকুরীর জন্যে এককালে তার অধিনস্ত কর্মী বর্তমান মন্ত্রীকে বলতে বিব্রতবোধ করেন, বলেন অন্যের অনুগ্রহে অধিকার অর্জন করা যায় না, ভিক্ষা পাওয়া যায়। আর আজ সত্যিকারের ভিখারির লাইনে খাড়াতে তার আজন্ম বিশ্বাস,,, তাহলে কি সত্যি এই করোনাকালে মানুষ বড়ো অসহায়।
লেখক : কবি স্বপন মুসলমান।