স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালা ও আমি

211

২০১৫ সাল। বোনের অপারেশন হয়েছে। ও পজেটিভ ৫ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। নিজের শরীর থেকে ১ ব্যাগ রক্ত দিয়েছি। কিন্তু প্রয়োজন আরো ৪ ব্যাগ। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। তৎকালীন সময়ে রক্তের জন্য অনেক বন্ধুদেরকে ফোন দিয়েছি। রক্ত পাইনি তবে পেয়েছি নানা ধরনের অজুহাত। তখন মনে অনেক কষ্ট জমে ছিলো।

হঠাৎ স্মরণ হলো আমার গ্রামের এক বড় ভাই এইম ফ্যাশনের সত্বাধিকারী নুরুল আমিন ইমন ঢাকায় বসবাস করেন। ভারাক্রান্ত মনে উনাকে ফোন দেই এবং রক্তের বিষয়ে উনার সাথে আলাপ হয়। তাকে আমি বলেছিলাম যে ভাই আমার ৪ ব্যাগ রক্ত লাগবে যদি আপনে দেন তাহলে আমি ঢাকায় আসবো। তিনি জবাবে বলেছিলেন তুমি ঢাকায় আসো আমি রক্ত দিবো। তারপর আমি দেরি না করে আমার মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। ঢাকায় যাওয়ার পর বড় ভাই নুরুল আমিন ইমন ১ব্যাগ ও তার বন্ধু ফিরোজ হাওলাদার ভাই আরো ১ব্যাগ রক্ত দিলেন। অর্থাৎ ২ব্যাগ রক্ত নিয়ে আমি সিলেটে আসি এবং পর্যায়ক্রমে এই ২ ব্যাগ রক্ত আমার বোনকে পুশ করি। সেদিন আমি অনুভব করেছিলাম রক্ত কি জিনিস, আর এর মুল্য কতটুকু।

তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এলাকার সচেতন যুব সমাজকে নিয়ে একটি সংগঠন করবো। যে সংগঠন আর্তমানবতার কল্যানে কাজ করবে। আলাপ হলো আমার গ্রামের যুব সমাজের সাথে এবং তারা আমার সাথে সহমত পোষণ করলো। সাথে সাথে আমি সংগঠনের বিষয়ে বড় ভাই নুরুল আমিন ইমনের সাথে কথা হয় এবং তিনিও আমার সাথে সহমত পোষণ করেন এবং বিভিন্ন অনুদানের আশ্বাস দেন। সেই থেকে আর্তমানবতার কল্যানে যাত্রা শুরু।

১৪ই জুলাই ২০১৫ সাল। “স্বার্থনয় ত্যাগই আমাদের ধর্ম, শিক্ষা সেবা উন্নয়নই আমাদের সফলতা” এই স্লোগানকে সামনে রেখে বড় ভাই নুরুল আমিন ইমনকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি করে আমাদের শেরপুর গ্রামের শিক্ষিত ১১জন সদস্য নিয়ে স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালা নামের একটি সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু করি।

শুরুটা একটু চ্যালেন্জিং হলেও এই যাত্রা থেমে থাকেনি। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার অভিষেক ঘঠে। অভিষেক হওয়ার পর সংগঠনে নিয়মিত সময় দেন আমার বন্ধু ছাদিকুর রহমান, স্নেহাশীষ আইমান আহমদ, মামুনুর রশীদ, জাবের আহমদ, এমাদ উদ্দিন, ইয়াহইয়া আহমদ, জাবির আহমদ, কামরুল আলম, জহির মাহমুদ, আদনান আহমদ, শাহীন আহমদ, সুমন চন্দ্র, কামরুল ইসলাম ইয়াহিয়া আহমদ মুন্না, সাজুল ইসলাম সহ আরো অনেকে। বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৫০ জন।

স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার সদস্য ও শুভাকাঙ্খীদের আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে একে একে শুরু হলো স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার বিভিন্ন কার্যক্রম। শুরুতেই স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার উদ্যােগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বিনামূল্যে শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ, মুক্তিযোদ্বা সম্মাননা, শিক্ষক সম্মাননা, গুণীজন সংবর্ধনা, শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণ, বিনামূল্যে শিক্ষা সেবা প্রদান প্রকল্প, খাদ্য সামগ্রী বিতরণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযানসহ প্রায় দুই শতাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে নিয়মিত রক্তদান সেবা চলমান রয়েছে।

স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার মাধ্যমে আর্তমানবতার কল্যানে কাজ করা জন্য সিলেট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে সিলেট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সাবেক এমপি আমায়তুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর হাত থেকে সম্মাননা পাবো তা কখনো ভাবতে পারিনি। যা আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। এরপর আমার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ স্বপ্ন রক্তদান সমাজ কল্যান ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদের সোলেমান হলে দৈনিক শুভপ্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক সরওয়ার হোসেনের হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা এবং সিলেট ইচ্ছাপূরণ সামাজিক সংগঠনের উদ্যােগে সিলেট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা গ্রহণ করি।

এছাড়া ওসমানী স্মৃতি পরিষদ বাংলাদেশ কর্তৃক গোলাপগঞ্জ উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আমার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ সাবেক এম পি সেলিম উদ্দিন’র হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা, গোলাপগঞ্জ পৌরসভা অডিটোরিয়ামে ভাইস চেয়ারম্যান মনসুর আহমদ’র হাত থেকে সম্মাননা, গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুনুর রহমানের হাত থেকে সম্মাননা, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আমিনুল ইসলাম রাবেল’র হাত থেকে সম্মাননা, চারখাই ইউনিয়ন অডিটোরিয়ামে বিয়ানীবাজার উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মুফতি শিব্বির আহমদের হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুল খালিক স্যারের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহন করি। যা সত্যিই সামাজিক অঙ্গনে কাজ করতে এই সম্মাননা গুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

আজ দেখতে দেখতে স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার পাঁচটি বৎসর পুর্ণ হলো। অর্থাৎ আগামী ১৪ই জুলাই স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালা ৬ষ্ঠ বছরে পদার্পণ করবে। এই শুভলগ্নে স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালার সকল সদস্য, উপদেষ্টা ও শুভাকাঙ্খীদের প্রতি রহিলো আমার অফুরন্ত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।

লেখক : মোঃ রুবেল আহমদ, সভাপতি, স্বেচ্ছা সেবক পাঠশালা।